You are currently viewing পোড়াবাড়ির বিখ্যাত চমচম ইতিহাস ও চমচম তৈরির রেসিপি
পোড়াবাড়ির চমচম কেন বিখ্যাত ইতিহাস ও তৈরির রেসিপি

পোড়াবাড়ির বিখ্যাত চমচম ইতিহাস ও চমচম তৈরির রেসিপি

চমচম অনেক সুস্বাদু একটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি জাতীয় খাবার। এর গুন এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে একে মিষ্টির রাজা নামে ডাকা হয়। আসাম থেকে আশা একজন স্বপ্নবাজ মানুষের হাত ধরে টাংগাইলের পোড়াবাড়ি গ্রামে এই সুস্বাদু চমচমের উৎপত্তি হয়। 

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই মিষ্টি বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানসহ আশেপাশের দেশের মন জয় করে নিয়েছে। আমাদের আজকের লেখায় আমরা চমচমের উৎপত্তি, বিকাশ, বিখ্যাত হওয়ার কারণ এবং এর রেসিপি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। 

পোড়াবাড়ির চমচম কেন বিখ্যাত?

বগুড়ার দই যেমন বিখ্যাত ঠিক টাঙ্গাইল জেলার পোড়াবাড়ির এই চমচম ও বেশ বিখ্যাত। চমচম একটি মুখরোচক এবং রসালো মিষ্টান্ন। স্বাদে অনন্য এই মিষ্টি ঐতিহ্যবাহী টাংগাইলের জনপ্রিয় খাবার। একটি খাবার বিখ্যাত হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উক্ত খাবারের স্বাদ একদম স্বতন্ত্র এবং সবার পছন্দের হতে হবে। অর্থাৎ বিখ্যাত জিনিস স্বাদে এবং গুনে অন্যান্য জিনিস থেকে একদম আলাদা হয়।

তো আমরা যখন চমচমের নাম শুনি তখন আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একটি পোড়া মাটির রঙের বড় মিষ্টি। যার উপরের অংশ একটু পুরু ও শক্ত কিন্তু ভিতরের দিকে একদম নরম এবং সফট। সম্পূর্ণ খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে এই মিষ্টি তৈরি করা হয়। চমচম তৈরি করার সময় ছানা তৈরি থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ের মিষ্টি তৈরি করতে বিশেষ পদ্ধতি এবং বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়। এই কারণে এই মিষ্টি খেতে যেমন মজা লাগে তেমনি অনেক সুন্দর ঘ্রাণ আসে।

মূলত এই অনন্য স্বাদ এবং মিষ্টি গন্ধের জন্য চমচম এত বিখ্যাত। তাছার ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এটি প্রায় ২০০ বছর থেকে প্রচলিত। এত লম্বা সময় কোন ধরনের বিকৃতি ছাড়াই তৈরি হয়ে আসার কারণে চমচম তার খ্যাতি ধরে রাখতে পেরেছে। নিচে পোড়াবাড়িরর চমচমের ইতিহাস বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো। 

পোড়াবাড়িরর চমচমের ইতিহাস

বলা হয়ে থাকে “চমচম, টমটম ও শাড়ি”, এই তিনে টাঙ্গাইলের বাড়ি। সূচনা কাল থেকেই টাংগাইল বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে অনেক পুরোনো ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে এই জেলার পাশেই যমুনা নদী থাকায় অর্থনৈতিক ভাবে এই এলাকা অনেক এগিয়ে গেছে। 

তো বাংলাদেশের অনেক জায়গায় তাদের স্বতন্ত্র ঐতিহ্যবাহী খাবার রয়েছে। এদের মধ্যে বগুড়ার দই, মহাস্থানের কটকটি, নাটোরের কাঁচাগোল্লা,গাইবান্ধার রসমঞ্জুরী, পুরান ঢাকার বিরিয়ানি ও বাকরখানি ইত্যাদি অন্যতম। তো এই সকল খাবারের তার নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। ঠিক তাদের মতই টাংগাইলের সুনাম বৃদ্ধিকারী খাবার হচ্ছে পোড়াবাড়ির চমচম। 

টাংগাইলের চমচমের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। তৎকালীন সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই সময় টাংগাইলের প্রধান শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে পোড়াবাড়ি নামক একটি গ্রাম ছিল। সেই গ্রাম ঘেঁসে বয়ে চলা ধলেশ্বরী নদীতে তখন জমজমাট ব্যবসায়িক যাতায়াত ছিল। সময়ের সাথে সাথে গুরুত্বপূর্ণ পোড়াবাড়ি গ্রামকে নদীবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। 

তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে আসাম রাজ্য থেকে দশরথ গৌড় নামে একজন টাংগাইলের পোড়াবাড়ি গ্রামে আসে। সে আগে থেকেই আসামে মিষ্টি তৈরি করতো জন্য এখানে সাময়িক কালের জন্য একটি দোকান প্রতিষ্ঠা করে এবং পরীক্ষামূলক ভাবে চমচম তৈরি করা শুরু করে। শুরুর দিকে গরুর খ্যাতি দুধ এবং ধলেশ্বরী নদীর পানি দিয়ে মিষ্টির ছানা তৈরি করা হতো। অনেকেই বলে থাকে উক্ত নদীর পানি মেশানো হতো জন্য এই মিষ্টি এত সুস্বাদু ছিল। 

যাইহোক, দশরথ গৌড়ের তৈরি করা চমচম ধীরে ধীরে চরম জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। তৎকালীন পোড়াবাড়ি গ্রাম সহ আসে-পাশের অনেক গ্রামের মানুষ তার তৈরি করা মিষ্টি খেতে আসতো। অন্যদিকে বন্দরে তখন বিভিন্ন জায়গার বড় বড় ব্যবসায়ী, সওদাগর ইত্যাদি আসতো। তাদের মাধ্যমে এই চমচম ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে শুরু করে বিশ্বের অনেক দেশে পৌঁছে যায়। 

এর সাথে সাথে চমচমের সুখ্যাতি ও চাহিদা বাড়তে থাকে। প্রথমদিকে পোড়াবাড়িতে ব্যাপক পর্যায়ে এই মিষ্টি তৈরি হওয়ার প্রচলন থাকলেও তা ধীরে ধীরে গোটা দেশে ছড়িয়ে পরে। যা ধারাবাহিকতায় পোড়াবাড়ি তার ঐতিহ্য পোড়াবাড়ির চমচম থেকে অনেক পিছিয়ে পরে এবং সেই জায়গা দখল করে নেয় টাংগাইল শহরের পাঁচআনি বাজার। 

বর্তমান সময়ে চমচমের উৎপত্তিস্থল পোড়াবাড়িতে সব মিলিয়ে মাত্র ৪ টি মিষ্টির দোকান রয়েছে যারা তাদের জৌলুস হারিয়েছে। অন্যদিকে শহরের পাঁচআনি বাজার চমচমের নতুন আড্ডাখানা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আমরা এখন যে টাংগাইলের চমচম খাই তা আসলে এই পাঁচআনি বাজারে থাকা মিষ্টির দোকান থেকে পাওয়া। 

যাইহোক, এই বাজারে অগণিত মিষ্টির দোকান আছে যারা প্রত্যেকে চমচম তৈরি করে তবে ঐতিহাসিক স্বাদ এবং স্বতন্ত্র গুন বজায় রেখে জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, গোপাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ও টাঙ্গাইল পোড়াবাড়ি মিষ্টি ঘর এই তিন দোকান চমচম তৈরি করে আসছে। 

বলা যায় এই তিন দোকান পুরো বাংলাদেশে চমচম তৈরি ও এই ইতিহাস টিকিয়ে রাখার নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে পোড়াবাড়ি তার ঐতিহ্য হারালেও এখন সেই গ্রামে রাত জেগে চমচমের জন্য ছানা এবং অন্যান্য উপকরণ তৈরি করার কাজ চলে। এই দুধ তারা চরাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে। যে কারণে দুধ গুলো যেমন খ্যাতি হয় তেমনি অনেক সুস্বাদু হয়। এই কারণে তা থেকে তৈরি হওয়া ছানা সুন্দর ঘ্রাণযুক্ত হয়। 

পোড়াবাড়ির চমচম তৈরির রেসিপি

বিখ্যাত পোড়াবাড়ির চমচম তৈরি করার জন্য সবার প্রথমে যে জিনিস মাথায় রাখতে হবে তা হল এতে কোন ভেজাল উপাদান যোগ করা যাবে না। অর্থাৎ চমচম তৈরি করার জন্য যে দুধ লাগে তা অবশ্যই দেশি গরুর হতে হবে। চরাঞ্চলের দেশি গাভির দুধ বেশি সুস্বাদু হয় এবং গুনে মানে অন্যান্য দুধ থেকে আলাদা হয়। নিচে সঠিক উপায়ে পোড়াবাড়ির চমচম তৈরি করার জন্য নিচে বর্ণনা করা পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারবেন। 

উপকরণঃ দেশি গাভির খাঁটি দুধ, চিনি, পানি, ময়দা এবং এলাচ দানা ইত্যাদি।

চমচম প্রস্তুত প্রনালী

টাংগাইলের পোড়াবাড়ির চমচম তৈরি করার জন্য ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রথমে দুধ থেকে ছানা তৈরি করে নিতে হবে। এরজন্য দেশি গাভির খাঁটি দুধ প্রথমে জ্বাল দিতে হবে। কিছু সময় জ্বাল দিলে দুধ ফোটা শুরু করবে এবং ঠিক এই সময় তাতে ত্বকজাতীয় কিছু অথবা ভিনেগার দিতে হবে। এতে দুধ ফেটে তা থেকে ছানা তৈরি হবে। 

ছানা তৈরি হওয়ার পর পানি ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পানি ঠান্ডা হলে ছানা একটি সুতি কাপড়ে তুলে তা চেপে পানি ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। তারপর উক্ত কাপড়ে শক্ত করে বেধে ঝুলিয়ে রাখতে হবে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা। এতে ছানা থেকে সব পানি ঝরে পরে যাবে। 

ছানা তৈরি হওয়ার পর মাওয়া তৈরি করে নিতে হবে। তো মাওয়া তৈরি করার জন্য গুঁড়ো দুধ, ঘি এবং পানি এক সাথে মিশিয়ে একটু গরম করে নিতে হবে। একটু জ্বাল দিলেই মাওয়া গরমে শক্ত হবে এবং কিছুসময় পর এটি ঠান্ডা হলে তা গুঁড়ো করে নিতে হবে। 

এবারে পানি ঝোড়ানো ছানা থেকে গোল গোল করে মিষ্টির সাইজ তৈরি করে তা চমচমের মত লম্বা এবং মোটা করে তৈরি করে নিতে হবে। তারপর একটি কড়াইয়ে চিনি এবং পানি মিশিয়ে তা জ্বাল দিতে হবে। এখানে অবশ্যই মশলা হিসেবে এলাচের দানা দিয়ে ভালো করে নাড়তে হবে। কিছুক্ষণ নাড়ার পর চিনি গলে শিরা তৈরি হবে। 

এখন এই ফুটন্ত শিরায় আগে থেকে তৈরি করা চমচম ছেড়ে দিতে হবে । কিছু সময় পর চমচম গুলো ফুলে উঠলে আঁচ কমিয়ে কড়াই ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ৩০ মিনিট পর চমচম গুলো উলটিয়ে দিয়ে আরও কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। এভাবেই খুব সহজে টাংগাইলের বিখ্যাত চমচম তৈরি করা যাবে। 

Leave a Reply