You are currently viewing অপূর্ব স্বাদের লেবুর আচার তৈরি পদ্ধতি, উপকারিতা, পুষ্টিগুণ 
লেবুর আচার

অপূর্ব স্বাদের লেবুর আচার তৈরি পদ্ধতি, উপকারিতা, পুষ্টিগুণ 

দৈনন্দিন জীবনে লেবু আমরা কম বেশি সকলেই খেয়ে থাকি। মূলত খাবারের স্বাদ বৃদ্ধির জন্য খাওয়া হয়। একে ভিটামিন সি এর উৎস। পুষ্টিবিদরা ভিটামিন সি এর চাহিদা পূরণে লেবু খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। লেবুর প্রসঙ্গ লিখতে গিয়ে একটি ভাইয়ার ট্রেন্ডিং “লেবুর পিনিক” নামের রেসিপির কথা মনে পরে গেলো। লেবুগুলো খোসাসহ পাতলা স্লাইস করে কেটে লবন মরিচ দিয়ে মেখে খাওয়ার মজাই আলাদা। 

প্রায় সবাই এই লেবুর পিনিক বাড়িতে বানিয়ে ট্রাই করেছিলেন। এবার আসি মূল কথায়, লেবু তো শরবত, সালাদ, মুড়ি মাখা ইত্যাদির সাথে খাওয়া হয়। তবে লেবুর আচারটি সাথে হয়তোবা খুব কম সংখ্যক মানুষ পরিচিত। চলুন আজকে এই আচার সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো। 

লেবুর আচার কি 

জনপ্রিয় কিছু আচার যেমন আম, বড়ই, চালতা ইত্যাদি এসকল আচার আমরা ছোট বেলা থেকেই খেয়ে এসেছি। বর্তমানে সময়ের সাথে সাথে ভিন্ন নতুন স্বাদের আচারের সাথে পরিচিত হচ্ছি আমরা। তেমনি এক ভিন্ন স্বাদের আচারের নাম হলো লেবুর আচার। অনেকে অতিরিক্ত টকের কারণে কাচা লেবু খুব বেশি খেতে পারেন না। তারা চাইলে এই আচার তৈরি করে খেতে পারেন। অনেকে এই আচার তৈরির সঠিক নিয়ম জানেন না। এতে আচার খেতেও তিতা লাগে। চলুন সঠিক পদ্ধতিতে লেবুর আচারের একটি সহজ রেসিপি জেনে নেওয়া যাক।

লেবুর আচার তৈরি করতে যা যা উপকরণ লাগছে-

  • লেবু ১ কেজি ৩০০ গ্রাম
  • লাল শুকনো মরিচ ১২টি
  • পাঁচফোড়ন ২টেবিল চামচ
  • সাদা সরিষার ২ টেবিল চামচ
  • সরিষার তেল হাফ লিটার
  • পাঁচফোড়ন গুড়ো ১ চা চামচ
  • রসুনের কোয়া ১ কাপ
  • ভিনেগার ৩-৪ টেবিল চামচ 
  • হলুদের গুড়া ১ টেবিল চামচ 
  • জিরার গুড়ো ১ টেবিল চামচ
  • মরিচের গুড়ো হাফ টেবিল চামচ 
  • বিট লবন ২ চা চামচ
  • লবন দুই টেবিল চামচ 
  • চিনি হাফ কাপ

প্রস্তুত প্রণালী

(১) প্রথমে লেবু পরিষ্কার করে ধুয়ে নিতে হবে। লেবুর গায়ে যেনো পানি লেগে না থাকে সেজন্য টিস্যু দিয়ে মুছে নিতে পারেন। এরপরে একটি লেবুর দুইপাশে অংশটি কেটে ফেলে দিতে হবে। এবার লেবুর মাঝ বরাবর কেটে চার টুকরা করে নিতে হবে। লেবুর মাঝের যে সাদা অংশ থাকে সেই অংশটি অবশ্যই কেটে ফেলে দিতে হবে। এই সাদা অংশ থাকলে অনেক সময় লেবুর আচারটি তিতা হয়ে যায়। এভাবে সবগুলো লেবু কেটে নিতে হবে।

(২) একটি প্যানে শুকনো মরিচ সামান্য একটু নেড়ে দিয়ে দিতে হবে। পাঁচফোড়ন ও সাদা সরিষার (লাল সরিষা দেড় টেবিল চামাচ দিতে হবে কারণ এই একটু বেশি ঝাঝালো হয়ে থাকে) দিয়ে সবগুলো একসাথে ভেজে নিয়ে গুড়ো করে নিতে হবে। একেবারে মিহি গুড়ো না করে আধা ভাঙা করে গুড়ো করতে হবে। এতে খেতেও ভালো লাগবে আবার দেখতেও ভালো লাগবে। 

মুখরোচক আচার তৈরিতে প্রয়োজনীয় আচার তৈরির মসলা ও এর ব্যবহার 

(৩) এবার আচারের ব্যবহারের জন্য প্যানে সরিষার তেল একটু গরম করে নিতে হবে, এরপরে পাঁচফোড়ন গুড়ো দিতে হবে। এতে আচারের টেস্ট অনেক ভালো আসবে। একবার হালকা বলক চলে আসলে চুলা থেকে নামিয়ে নিতে হবে। এবং স্বাভাবিক রুম তাপমাত্রা আসা পর্যন্ত  ঠান্ডা হতে দিতে হবে। 

(৪) এক কাপ পরিমাণ রসুনের কোয়া নিতে হবে, এটি বাটার জন্য কিছুটা ভিনেগার ব্যবহার করতে হবে। কোনো ভাবে পানি ব্যবহার করা যাবেনা। 

(৫) টুকরো করে রাখা লেবুর মধ্যে গুড়ো করে রাখা মসলা দিতে হবে। এরপরে হলুদের গুড়ো, জিরার গুড়ো, মরিচের গুড়ো (তবে ঝালটি কেমন খাবেন সেটার ওপর নির্ভর করে পরিমাণ বাড়াতে বা কমাতে পারেন আচার আইটেম ঝাল হলেই কিন্তু খেতে ভালো লাগে) বিট লবন দিতে হবে। এতে আচারের স্বাদ অনেক ভালো আসবে।  

লবন (লেবুর আচারে লবনের পরিমানটি একটু বেশি ব্যবহার করতে হয়। তারপরও আপনার টেস্ট অনুযায়ী আপনি ব্যবহার করতে পারেন) রসুন বাটা ও চিনি ব্যবহার করতে হবে। এবার সবগুলো উপাদান আলতো হাতে মেখে নিতে হবে। অনেক সময় নিয়ে কচলিয়ে মাখা যাবেনা। এতে তিতা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়াও লেবুর আচার কখনোই চুলায় দেওয়া যাবেনা। এতেও তিতা হয়ে যাবে । 

(৬) এবার মেখে নেওয়া লেবুর টুকরো একটি কাচের বোয়ামে তুলে রাখতে হবে। খুব বেশি চেপে চেপে বোয়ামে রাখা যাবেনা। এর মধ্যে সরিষার তেল দিয়ে লেবুগুলো ডুবিয়ে রাখতে হবে। এরপরে আচারটি রোদে দিতে হবে। কড়ারোদে প্রায় ৭-৮ দিন পর্যন্ত  দিতে হবে। তারপরেই খাওয়ার উপযুক্ত হবে। এই রোদে দেওয়ার জন্য আচার তেতো হবে না। 

এবং লেবুর খোসাও টকভাব চলে আসবে। লেচুর আচার সঠিক ভাবে বানাতে পারলে এই আচারটি পছন্দের তালিকায় চলে আসবে। এবং সারাবছর জুরে আচারটি আপনার ঘরেতেই থাকবে। এছাড়া কাগজি লেবু দিয়েও আচার তৈরি করা যাবে।

লেবুর আচারের উপকারিতা
লেবুর আচারের উপকারিতা

লেবুর আচারের উপকারিতা ও পুষ্টিগুণ

আমরা সকলেই জানি লেচুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য পুষ্টিগুণ আছে যা আমাদের স্বাস্থ্য উন্নত করতে কাজ করে। 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী রাখা অনেক জরুরি। এতে বিভিন্ন রোগ এড়ানো সম্ভব হয়। অর্থাৎ সহজে শরীরে কোনো রোগ বাসা বাধতে পারেনা। লেবুর আচার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি আমাদের ইমিউনিটি সিস্টেমকে শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করে। লেবুর আচারটি পরিমাণ মতো খেলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।

জনপ্রিয় কিছু আচারের নাম, উপকারিতা ও আচার কেন এত জনপ্রিয়?

হাড় মজবুত করতে

শরীরের আয়রন ও ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড়ের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। মূলত বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই সমস্যাটি গুরুতর হতে থাকে। এটি প্রতিরোধ করতে ভিটামিন, পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য খেতে হবে। লেবুর আচারে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম রয়েছে। তাই খুব সহজে এসকল পুষ্টি পেতে এই আচারটি খেতে পারেন। এতে আপনার হাড় থাকতে মজবুত ও সুরক্ষিত।

হজমশক্তি বাড়াতে

অতিরিক্ত তেল চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহনের ফলে হজমজনিত সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যা এড়াতে লেবুর আচারটি বেশ উপকারী। এই আচারটি নিয়ম করে খেলে হজমশক্তি বেড়ে যায়, এবং হজমের সকল সমস্যা দূর হয়ে যায়। কারণ এতে থাকা এনজাইম শরীরের টক্সিন অপসারণে সহায়তা করে হজমশক্তি বৃদ্ধি করে।

হার্টকে সুস্থ রাখতে

সাধারণত ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে হৃদরোগ দেখা যায়। হার্ট দুর্বল হয়ে পরে। যেহেতু লেবুর আচারে কোনো ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নেই তাই এটি অনায়েসে খাওয়া যেতে পারে। যা আপনার হার্টকে রাখবে সুরক্ষিত।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে

লেবুর আচারের মধ্যে এমন সব উপাদান আছে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে। যাদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে তারা খাদ্য তালিকায় এই আচারটি রাখতে পারেন। 

লেবুর আচারের ভিটামিন নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণ

ইউটিউবে সার্চ করলে দেখতে পারবেন, লেবুর আচার তৈরির সময় চুলার জ্বাল দিয়ে তৈরি করছেন, এটি কখনোই করা যাবেনা। এতে লেবুর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যাবে। লেবুতে প্রচুর ভিটামিন রয়েছে, বেশি তাপের ফলে ভিটামিন নষ্ট হয়। তাই এই আচার কখনোই চুলায় জ্বাল দিয়ে তৈরি করা যাবেনা। এছাড়াও আচারে অন্যান্য ভিটমিন রয়েছে যেমন ভিটামিন সি ও বি। এসকল উপাদানও তাপের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। 

আচারের ব্যবহৃত লবন ও মিষ্টি সম্পর্কে কিছু তথ্য

যারা জটিল রোগে ভুগছেন তারা এই আচারসহ অন্য সকল আচার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। আচারে লবন বেশি থাকে যা রোগীদের জন্য অনেক ক্ষতিকর। এছাড়াও যারা ডায়াবেটিসের রোগী তারা আচার খাওয়ার ব্যাপারে সর্তক থাকবেন। আচারে চিনি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। আচার সংরক্ষণের জন্য ভিনেগার ব্যবহার করা হয়। তাই আচার খাওয়ার ফলে ওজন কমতে সহায়তা করে। 

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা লেবুর আচার কি, তিতা ছাড়া আচার তৈরির সঠিক পদ্ধতি ও উপকারিতা সম্পর্কে জানতে পারলাম। আশা করছি এটি পড়ার পড়ে আপনি ঘরেতেই এই আচার তৈরি করে সারা বছর সংরক্ষণ করতে পারবেন।