You are currently viewing সরিষা ফুলের মধু খাওয়ার নিয়ম, উপকারিতা এবং এই মধু চেনার উপায়?
সরিষা ফুলের মধু

সরিষা ফুলের মধু খাওয়ার নিয়ম, উপকারিতা এবং এই মধু চেনার উপায়?

সরিষা বাংলাদেশের একটি পরিচিত তেল জাতীয় শস্য। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই দেশের আনাচে কানাচে সরিষা ফুলের হলুদে ভোরে উঠে। এই সময় টাকে কাজে লাগিয়ে মধু ব্যবসায়ীরা সরিষা ক্ষেতের পাশে মধু সংগ্রহ করার বক্স বসায়। 

সেখান থেকে সংগ্রহ করা হয় পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ সরিষা ফুলের মধু। আমাদের আজকের লেখায় আমরা সরিষা ফুলের মধু খাওয়ার নিয়ম উপকারিতা ও চেনার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। 

সরিষা ফুলের মধু খাওয়ার নিয়ম

মধু একটি সুস্বাদু ও উৎকৃষ্ট মানের খাবার। এতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান থাকায় মধুকে ঔষধি হিসেবেও খাওয়া যায়। সাধারণত মধু খাওয়ার কোনো অবশ্যপালনীয় নিয়ম নেই। তবে দেহের গঠন ও হজম প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে গবেষক দল কিছু সাধারণ নিয়ম মানতে বলে থাকেন। 

তো যে কোন প্রকারের মধু খাওয়ার উৎকৃষ্ট সময় হচ্ছে সকালে খালি পেটে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে। এই সময় বাদেও আপনি অন্য সময়ে খেতে পারবেন তবে সকালে এবং রাতে খালি পেটে খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। 

পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে সরিষা ফুলের মধুতে ফ্রুকটোজ ও গ্লুকোজ অনেক বেশি পরিমাণে থাকে। এদের সাথে সাথে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি এবং সি থাকে। এছাড়া সরিষা ফুলের মধুতে সুক্রোজ ও মালটোজ খুব অল্প পরিমাণে থাকে যা জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করে। 

এই কারণে প্রতিদিন সকালে ও রাতে খালি পেটে কমপক্ষে এক চা চামচ করে মধু খেতে বলা হয়। র হিসেবে অর্থাৎ কোন অন্য উপাদান না মিশিয়ে মধু খাওয়া প্রচলিত থাকলেও উপযোগ হিসেবে আরও অনেক জিনিসের সাথে সরিষা ফুলের মধু খাওয়া যায়। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। 

জেলি হিসেবে

জেলির সাথে সরিষা ফুলের মধু খাওয়ার প্রচলন বেশ আগে থেকেই। এর সব থেকে বড় কারণ সরিষা ফুলের মধু খুব দ্রুত জমে জেলির মত হয়ে যায়। অর্থাৎ এই মধু জেলির মত তৈরি করতে কোন চাপ প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় না। বরং প্রাকৃতিকভাবেই এটি জেলি তে পরিণত হয়। এই কারণে সরিষা ফুলের মধু রুটির সাথে জেলি হিসেবে খাওয়া হয়। 

শরবত হিসেবে

সরিষা ফুলের মধুর সাথে লেবুর রস ও কুসুম গরম পানি মিশিয়ে তৈরি করা শরবত বেশ সুস্বাদু হয়। অতুলনীয় স্বাদের পাশাপাশি এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। অন্যদিকে এই শরবত দেহের মেদ কমানোর পাশাপাশি শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। এই জন্য শরবত হিসেবে সরিষা ফুলের মধু বেশ প্রচলন পেয়েছে। 

চিনির বিকল্প হিসেবে

মধুতে প্রচুর পরিমাণে উপকারী সুগার থাকে। যা মিষ্টির দিক দিয়ে সাধারণ প্রোসেসিং চিনির থেকে অনেক বেশি। অন্যদিকে প্রোসেসিং চিনিতে বিভিন্ন কেমিক্যাল ইউজ করা হয়। এই কারণে সাধারণ চিনি খেলে তা স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে সরিষার ফুলের মধু তে যে চিনি থাকে তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তাছাড়া এই মধুতে কোনো কোলেস্টেরল নেই। 

ড্রাইফুডের সাথে 

ড্রাইফুডের সাথে মধু মিশিয়ে খাওয়া বর্তমানে অনেক প্রচলন পেয়েছে। সবার মাঝে অনেক বেশি আলোড়ন তৈরি করার প্রধান কারণ হচ্ছে এই খাবার অনেক উচ্চ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। সাধারণত ড্রাইফুড অনেকগুলো শুকনো ফল, বাদাম ও মধু দিয়ে তৈরি করা হয়। এদের সাথে সরিষা ফুলের মধু মিশিয়ে অনেক উন্নতমানের ড্রাইফুড তৈরি করা যায়। 

দুধের সাথে

দুধের সাথে মধু খাওয়া অনেক পুরোনো একটি রিতি। যখন দুধের সাথে মধু মিশিয়ে খাওয়া হয় তখন উপায়ের পুষ্টিগুণ একত্রিত হয়। এতে যেমন স্বাদ বৃদ্ধি পায় তেমনি পুষ্টিগুণ বেড়ে যায়। এই কারণে যাদের শরীর দুর্বল ও কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় ভুগে তাদের জন্য দুধের সাথে মধু মিশিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। 

অন্যান্য উপাদানের সাথে 

উপরে বর্ণিত বিভিন্ন উপাদানের সাথে যেমন মধু খাওয়া যায় তেমনি এদের বাইরেও মধু খাওয়ার আরও অনেক উপায় আছে। সাধারণত আমরা যে যে কাজে চিনি ব্যবহার করি সে সকল কাজে মধু কে একটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যদিকে চা এর সাথে অথবা কালোজিরার সাথে সরিষা ফুলের মধু মিশিয়ে খাওয়া অনেক উপকারী। কোলেস্টেরল মুক্ত এই মধু স্বাদে এবং গুনে অন্যান্য মধুর মতই গুরুত্বপূর্ণ।

সরিষা ফুলের মধুর উপকারিতা

মধু শব্দটি একটি সুপরিচিত উপকারী পুষ্টি উপাদানের নাম। মধুর কথা শুনলেই আমাদের মনে একটি বিশ্বাস তৈরি হয়। এছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় মধুর বিভিন্ন উপকারিতার কথা প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি মধুর আলাদা আলাদা পুষ্টিগুণ রয়েছে। নিচে সরিষা ফুলের মধুর উপকারিতার কথা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। 

কফ দূর করে 

আমরা জানি সরিষা ঠান্ডা জনিত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করে। এর ঝাঁজ ভাব কাশি, সর্দি ইত্যাদি সমস্যা নিরাময় করে। অন্যদিকে মধু প্রাচীন কাল থেকেই কফ সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করে। যখন এই সরিষা ফুলের মধু খাওয়া হয় অথবা বুকে মাখা হয় তা ঠাণ্ডার সমস্যা দূর করে দেয়। অর্থাৎ এটি একটি প্রাকৃতিক কফ নিরাময়ক হিসেবে কাজ করে। 

রক্ত চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে 

মধু রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে। যখন নিয়মিত সরিষা ফুলের মধু খাওয়া হয় তখন তা রক্ত পরিষ্কার করে। রক্তে থাকা উপাদানগুলোর বিন্যাস নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্বাভাবিক চলাচল অব্যাহত রাখে। এতে উচ্চরক্তচাপ সহ অন্যান্য রক্তজনিত সমস্যা নিরাময় হয়। 

হজম বৃদ্ধি করে

সরিষা ফুলের মধু হজমে সহায়ক এনজাইম দিয়ে পরিপূর্ণ। যখন খালি পেটে মধু খাওয়া হয় তখন তা পেটের মধ্যে থাকা গ্যাস বের করে দেয় এবং এনজাইমগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে 

সরিষা ফুলের মধু প্রাকৃতিকভাবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত। এই কারণে নিয়মিত এই মধু খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং এনার্জি বুস্ট হয়। সরিষা ফুলের মধুতে ফ্ল্যাভোনয়েড এবং ফেনোলিক যৌগ প্রচুর পরিমাণে থাকে যা দেহে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সমস্যা দূর করে দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমায়। 

রক্তনালির সমস্যা দূর করে

সরিষা ফুলের মধুর সাথে কালোজিরা মিশিয়ে খেলে তা রক্ত নালির বিভিন্ন সমস্যা দূর করে। এতে পুরো দেহের রক্ত চলাচলের উন্নতি হয় এবং দেহের সকল কোষ সচল থাকে। এই জন্য হৃদরোগের ঝুঁকি কমে এবং শরীর সুস্থ থাকে। 

ক্ষত নিরাময় করে 

সরিষা ফুলের মধু অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ। এতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকার কারণে কোন জীবাণু টিকে থাকতে পারে না। এই কারণে নিয়মিত সরিষা ফুলের মধু খেলে তা দেহের বিভিন্ন ক্ষত নিরাময় করতে সহায়তা করে। 

ওষুধই গুন সমৃদ্ধ 

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাচীন যুগ থেকে মধু ঔষধ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। কোন ক্ষত নিরাময়ের পাশাপাশি জ্বালাপোড়া নিরাময় করার জন্য মধু ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া অ্যালার্জি সমস্যা দূর করতে সরিষা ফুলের মধু অনেক ভালো কাজ করে। 

ত্বকের যত্ন নেয় 

প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজিং গুন থাকায় মধু দিয়ে ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রিম এবং লোশন তৈরি করা হয়। এর পুষ্টিগুণের কারণে ত্বকের দাগ দূর করা সহ মরা কোষ দূর করা ইত্যাদি কাজে সরিষা ফুলের মধু ব্যবহার করা হয়। 

সরিষা ফুলের মধু চেনার উপায়

সরিষা ফুলের মধু চেনা অনেক সহজ। নিচে এই মধুর কিছু বৈশিষ্ট্য দেওয়া হল যে দেখে সহজেই চেনা যায়। 

  • সরিষা ফুলের মধু দেখতে হালকা অ্যাম্বার রঙের হয়ে থাকে। 
  • এই মধুর সব থেকে বড় গুন ঠাণ্ডায় এটি পরিপূর্ণভাবে জমে যায়। 
  • অনেকদিন ধরে জমে থাকার কারণে সাদা রঙের হয়ে যায়।  
  • এই মধুর ঘ্রাণ সরিষার মতই হয়।  
  • স্বাদে একটু ঝাঁঝালো হয়। 
  • সারাবছর প্রায় জমে থাকে।
  • ঘনত্ব ঘন অথবা পাতলা যাই হোক সারাবছর এই মধু জমে থাকে। 
  • সংগ্রহ করার সময় এতে ফেনা হতে দেখা যায়। 

এখানে সরিষা ফুলের মধু কি কারণে এত বিখ্যাত সেই বিষয়ে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি খাওয়ার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আশা করি লেখাটি পরে সরিষা ফুলের মধু সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভ করেছেন। 

Leave a Reply