You are currently viewing সয়াবিন নাকি সরিয়ার তেল কোনটি ভালো?

সয়াবিন নাকি সরিয়ার তেল কোনটি ভালো?

আমাদের নিত্যদিনের খাবার রান্না করার জন্য সয়াবিন ও সরিষার তেল ব্যবহার করা হয়। রান্নার জন্য উপযোগী এই তেল দুটি আমাদের জন্য যেমন পুষ্টিগুণ বয়ে আনে তেমনি এর রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে অতিরিক্ত সয়াবিন তেল খেলে তা আমাদের দেহে নানান ধরনের রোগের সৃষ্টি করে। আমাদের আজকের লেখায় আমরা সয়াবিন নাকি সরিয়ার তেল কোনটি ভালো তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। কথা না বাড়িয়ে চলুন কোন তেল বেশি স্বাস্থ্যকর তা জেনে নেওয়া যাক। 

সয়াবিন নাকি সরিয়ার তেল?

সুস্বাদু রান্না করার জন্য তেলের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে সব থেকে বেশি প্রচলিত ভোজ্য তেলের মধ্যে সয়াবিন ও সরিষার তেল অন্যতম। যদিও রান্নার কাজে সয়াবিন তেলের ব্যবহার বেশি হয় তবে সরিষার তেল ভর্তা এবং ভাজি করার জন্য বেশি উপযুক্ত। ভালো ও মন্দের দিকগুলো বিবেচনা করলে দেখা যাবে এই দুই ধরনের তেলেই এর উপস্থিতি আছে। যাইহোক, নিচে সরিষার ও সয়াবিন তেলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকারী ও অপকারী বৈশিষ্ট্য দেওয়া হল। যা দেখে আপনি সহজেই বিবেচনা করতে পারবেন আপনার ঘরের রান্নার জন্য কোন তেল সব থেকে বেশি উপযুক্ত। 

সয়াবিন তেল

সয়াবিন তেল

সয়াবিন তেল খাওয়ার তেল হিসেবে পুরো বিশ্বব্যাপী পরিচিত। গৃহস্থালি রান্না-বান্নার পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট ও হোটেলগুলোয় এই তেল ব্যবহার করা হয়। সয়াবিনের বীজ থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই তেল প্রস্তুত করা হয়। এই তেলের স্মোক পয়েন্ট হল প্রায় ২৫৬ ডিগ্রি। সয়াবিন তেল স্বাস্থ্যের জন্য মোটামুটি উপকারী। এতে কমপক্ষে ৩৫ শতাংশের মত স্যাচুরেটেড ও ৫০ শতাংশের মত আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। ১০০ গ্রাম সয়াবিন তেলের মধ্যে ৯ ক্যালোরির মত শক্তি থাকে। 

এই সকল পুষ্টিগুণ বাদেও এই তেলে ভিটামিন এ, ডি এবং অল্প মাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাট থাকে। সয়াবিন তেলের আরেকটি বড় ও ইউনিক গুন হচ্ছে এর মধ্যে কোন ইউরিক অ্যাসিড নেই যা হার্টের ক্ষতি করে। নিচে এই তেলের উপকারী ও অপকারী দিক আলোচনা করা হলো। 

সয়াবিন তেলের উপকারিতা

  • ভিটামিন এ, ই ও ডি সরবরাহ করে। 
  • ইউরিক অ্যাসিড নেই
  • অল্প পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাট আছে 
  • অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে 
  • ক্ষতিকর ও স্বাস্থ্যকর কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে 
  • ৫০ শতাংশের বেশি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট সরবরাহ করে 
  • হাড়, চোখ এবং ত্বকের সর্বাত্মক সুরক্ষা নিশ্চিত করে 
  • হার্ট কর্মক্ষম রাখে
  • এর স্মোক পয়েন্ট ২৫৬ ডিগ্রি

সয়াবিন তেলের অপকারিতা দিক

  • অতিরিক্ত গ্রহণে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে কোলেস্টেরলের মাত্রার তারতম্য ঘটিয়ে ব্লাড সুগার বাড়িয়ে দেয়। এতে রক্তে শর্করা বেড়ে ডায়াবেটিস বেড়ে যায়।
  • পাম অয়েল সহ অন্যান্য ভেজাল মেশানো হয়। 
  • এই তেল দেহে খারাপ ও ক্ষতিকর ফ্যাটের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। 
  • অতিরিক্ত সয়াবিন তেল খেলে তা হৃদরোগের কারণ হতে পারে। 

সরিষার তেল 

সরিষা আমাদের গ্রাম বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী তেল জাতীয় অর্থকরী ফসল। কারণ সরিষার কোনো অংশ ফেলে দেওয়া হয় না। কারণ এর বীজ থেকে তেল ও খৈল হয় আবার উচ্ছিষ্ট অংশ জ্বালানি অথবা জমির জৈব সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সরিষার তেল রান্নাবান্নার জন্য একটি আদর্শ উপকরণ। দেখতে লালচে কালো রঙের এই তেল স্বাদে একটু ঝাঁজালো হয়। এই ঝাঁঝালো স্বাদ ও ঘ্রাণের কারণে ভর্তার সাথে অথবা মেজবানি খাবার রান্নার সময় সরিষার তেল ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, এই তেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যে কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এই তেল সহায়তা করে।

তাছাড়া এই তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম থাকে তবে পলি-আনস্যাচুরেটেড ও মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে যা হার্টের জন্য উপকারী। সরিষার তেলে শরীরের জন উপকারী ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাট আছে। এগুলো ছাড়াও সরিষার তেলে অনেক উপকারী উপাদান থাকে। সর্বোপরি এই তেলে রান্না করা খাবার খেতে অনেক সুস্বাদু। যাইহোক, নিচে সরিষার তেলের উপকারী ও অপকারী দিক আলোচনা করা হলো। 

সরিষার তেলের উপকারিতা দিক 

  • সরিষার তেলের রয়েছে অসাধারণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা। 
  • এটি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। 
  • এতে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাট নামক উপকারী ফ্যাট পাওয়া যায়। 
  • সরিষার তেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পলি-আনস্যাচুরেটেড ও মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। 
  • এতে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং ছত্রাক প্রতিরোধক উপাদান থাকে। 
  • ত্বকের কালো দাগ দূর করে। 
  • গ্লুকোসিনোলেট নামক উপাদান থাকায় এটি ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। 
  • চুল ঘন, কালো ও দীর্ঘ করে। 
  • শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রায় রাখতে সাহায্য করে। 
  • এছাড়াও আমাদের এই আর্টিকেল থেকে সরিষার তেলের হেলথ বেনিফিটের (স্বাস্থ্য উপকারিতা) আরো তথ্য পেতে পারেন।

সরিষার তেলের অপকারিতা দিক 

  • সরিষার তেলে প্রচুর পরিমাণ ইউরিক অ্যাসিড থাকে যা কিডনির জন্য ক্ষতিকারক। 
  • দীর্ঘদিন ব্যবহারে ত্বকের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। 
  • শিশুদের এই তেল খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। 
  • অতিরিক্ত পরিমাণে এই তেল ব্যবহার করলে হার্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

উপরিউক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করলে দেখা যাবে সয়াবিন ও সরিষার তেল নিজ নিজ অবস্থান থেকে সেরা। গুণাগুণের দিক থেকে দুটি তেল একই রকমের হলেও সরিষার তেলে সয়াবিন থেকে বেশি স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে। অন্যদিকে সরিষা নিজে আবাদ করে খাঁটি সরিষার তেল সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু খাঁটি সয়াবিন তেল বাজারে কিনতে গেলে প্রায় সময় ভেজাল তেল কিনতে হয়। তাছাড়া তেল দুইটি প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। অতএব রান্নার জন্য সয়াবিন ও সরিষা দুটোই উপযুক্ত এবং শরীরে মাখার জন্য সরিষার তেল উপযুক্ত। 

সয়াবিন তেল আর সরিষার তেলের মধ্যে পার্থক্য কি?

সয়াবিন ও সরিষার তেলের মধ্যে বিশেষ কিছু পার্থক্য আছে যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। 

স্মোক পয়েন্ট 

তেলের স্মোক পয়েন্ট হলো একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা যা পার হয়ে গেলে তেল পুড়ে ধোঁয়া ওঠা শুরু করে। অর্থাৎ যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ওভার হয়ে গেলে তেল পুড়ে যায় এবং ধোঁয়া ওঠা শুরু করে তাকে স্মোক পয়েন্ট বলে। স্মোক পয়েন্ট পেড়িয়ে গেলে রান্না করা খাবার পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। সয়াবিন তেলের স্মোক পয়েন্ট হলো ৪৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট এবং সরিষার তেলের স্মোক পয়েন্ট হলো ৪৮২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এখানে সয়াবিন তেল থেকে সরিষার তেলের স্মোক পয়েন্ট বেশি। 

ফ্যাটের পরিমাণ 

সাধারণত তেল বলতে আমরা ফ্যাটকেই বুঝি। ফ্যাটের পরিমাণের উপর নির্ভর করে তেলকে স্বাস্থ্যকর ও অস্বাস্থ্যকর বিবেচনা করা হয়। সেই দিক থেকে সয়াবিন তেলে প্রতি ১০০ গ্রামে ১৬ গ্রাম স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ২৩ গ্রাম মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ৫৮ গ্রাম পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। অন্যদিকে, সরিষার তেলে ৬০% মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, ২১% পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং প্রায় ১২% স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। ফ্যাটের দিক বিবেচনা করলে সরিষার তেল সয়াবিন তেলের থেকে বেশি স্বাস্থ্যকর। কারণ সরিষার তেলে বেশি স্বাস্থ্যকর ফ্যাট থাকে যা আমাদের শরীরের জন্য উপকারী।  

ক্যালোরির পরিমাণ 

যেহেতু তেলের মধ্যে ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে সেহেতু এটি ক্যালোরির জন্য অনেক ভালো একটি মাধ্যম। প্রতি ১০০ গ্রাম সরিষার তেলে ৮৮৪ ক্যালরি থাকে অন্যদিকে সমপরিমাণ সয়াবিন তেলে ক্যালরি থাকে ৪৩৬। মোটকথা সয়াবিন তেল থেকে সরিষার তেলে ক্যালোরি বেশি। 

পুষ্টিগুণ 

পুষ্টিগুণের দিক থেকে সয়াবিন ও সরিষার তেলের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। তবে খাঁটি সরিষার তেল সয়াবিন তেলের থেকে বেশি উপকারী পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। অর্থাৎ সরিষার তেল ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়, মেদ কমায়, ত্বকের কালো দাগ দূর করে, হাড় মজবুত করে, হার্টের সমস্যা দূর করে। অন্যদিকে সয়াবিন তেল অধিক পরিমাণে খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়া সহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। 

রং ও ঘনত্ব 

সয়াবিন তেল দেখতে পাতলা ও হালকা হলুদ রঙের হয় পক্ষান্তরে সরিষার তেল লালচে গাঢ় এবং ঘন হয়। 

দাম

বর্তমান বাজারে ১ লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৭৪ টাকা। অন্যদিকে ১ লিটার সরিষার তেলের দাম ৩৫০ টাকা থেকে ৩৬৫ টাকা। 

স্বাদ 

সয়াবিন তেলের নিজস্ব কোনো স্বাদ এবং গন্ধ নেই। এই তেল দিয়ে রান্না করা খাবারের মধ্যে স্বাদ এবং গন্ধের কোন পার্থক্য পাওয়া যায় না। অন্যদিকে সরিষার তেল থেকে একটি সুন্দর গন্ধ আসে এবং ঝাঁজালো স্বাদযুক্ত। 

সয়াবিন তেলের ক্ষতিকর দিক

সয়াবিন তেল সব থেকে বেশি প্রচলিত হলেও এর রয়েছে বেশ কিছু ক্ষতিকর দিক। নিচে সয়াবিন তেলের কিছু ক্ষতিকারক দিক উল্লেখ করা হলো। 

  • শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় 
  • ডায়াবেটিস এর ঝুঁকি বাড়ায় 
  • হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় 
  • পেটে আসিডিটি ও আলসারের সমস্যা সৃষ্টি করে 
  • শরীরের ওজন বৃদ্ধি করে 
  • হজম সমস্যার সৃষ্টি করে 
  • বদহজম, ডাইরিয়, পেট ব্যথার সৃষ্টি করে 
  • অতিরিক্ত সয়াবিন তেল খাওয়ার কারণে লিভার সিরোসিস সমস্যার সৃষ্টি হয় 

উপরিউক্ত আলোচনায় আমরা সয়াবিন এবং সরিষার তেলের মধ্যে প্রধান প্রধান পার্থক্যগুলো দেখলাম। তেল আমাদের দৈনন্দিন রান্নার কাজে ব্যবহার করা হলেও এর রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। কারণ অতিরিক্ত তেল খাওয়ার ফলে আমাদের বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এই লেখাটি পড়ার ফলে আশা করি অতিরিক্ত তেল খাওয়া কমানো সম্ভব হবে। 

Bornali Akter Borno

Bornali Akter Borno is a passionate food enthusiast and entrepreneur. From an early age, her love for culinary exploration led her to experiment with flavors and ingredients, ultimately inspiring her to work with Binni Food, an e-commerce brand dedicated to offering premium quality Organic Food and delectable treats to food enthusiasts in Bangladesh. Bornali's relentless pursuit of flavor and commitment to excellence have earned her recognition in the culinary world. Her journey is a testament to the power of passion and perseverance, showcasing how dedication to one's craft can lead to entrepreneurial success and culinary innovation.

Leave a Reply