বৃষ্টির দিনে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির পাতে একটুখানি আচার থাকলে খাবারের স্বাদ অমৃত হয়ে ওঠে। ছোট থেকে বড় যেকোনো বয়সের মানুষই আচার পছন্দ করে থাকেন। মৌসুমি ফল দিয়ে তৈরি করা হয় টক ঝাল মিষ্টি স্বাদের মজাদার সকল আচার।
একবার ভাবুন তো, শখের বসে অনেক যত্ন করে সারা মাসের জন্য বানানো আচারটি যদি মাস শেষ হতে না হতেই নষ্ট হয়ে যায় তাহলে কেমন লাগবে? চিন্তার কারণ নেই। আচার সংরক্ষনের জন্য দারুণ কিছু কার্যকরি উপায় বা সংরক্ষণ পদ্ধতি রয়েছে। আজকে আমরা আচার সংরক্ষণের উপায় নিয়ে আলোচনা করবো। তাই সময় নষ্ট না করে চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
আচার সংরক্ষণের উপায়
আচার বানানো যেমন কঠিন, তেমনি আচার সংরক্ষণ করাও বেশ জটিল। যদি একবার আচারে ছত্রাক সংক্রামন হয় তাহলে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পরে এবং স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে আচার সংরক্ষণ করাটা তুলনামূলক অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে একটু বেশি কষ্টস্বাধ্য। কারণ আবহাওয়া ঠান্ডা ও স্যাতসেতে হওয়ার কারণে খুব সহজেই আচারে ছত্রাক বা ফাংগাস দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।


আচারে পানি থাকা যাবে না
আচার তৈরির সময় হাতে যেন পানি লেগে না থাকে সেটি নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। কারণ পানি লেগে থাকলে আচারের দ্রুত ফাঙ্গাস পরতে পারে। এবং যেসব ফল বা সবজি দিয়ে আচার তৈরি হবে, তা ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়ার পরে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। সম্ভব হলে কিছুক্ষন রোদে দেওয়া যেতে পারে।
পরিমিত লবণ ব্যবহার
লবন যেকোনো খাবারের স্বাদ যোগ করতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা সকলেই জানি। এবং জেনে অবাক হবেন, এটিও আচারের প্রিজারভেটিসের কাজ করে। ফলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রামণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। খেয়াল রাখতে হবে আচারে লবনের পরিমান বেশি বা কম না হয়। অর্থাৎ সঠিক পরিমাণে লবন ব্যবহার করতে হবে।
স্বাস্থ্যকর ও ফ্রেশ তেল ব্যবহার করুন
আচার বেশি দিন সংরক্ষনের জন্য তেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তেল ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং ছত্রাকের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। তাই এমন ভাবে তেল দিতে হবে যাতে আচারের ওপর একটি স্তর পর্যন্ত ভেসে থাকে। এতে বায়ু প্রবেশ করতে পারবে না ও অক্সিজেনের অভাব সংগঠিত হবে। ফলে ব্যাকটেরিয়াও সহজে বাসা বাঁধতে পারবে না।
ভিনেগার ব্যবহার
ভিনেগার আমাদের সকলের পরিচিত একটি উপাদান। আমরা প্রায় সকলেই জানি এটি আচারের প্রিজারভেটিভস হিসেবে বেশ ভালো কাজ করে। এটি সিরকা নামেও পরিচিত। ভিনেগার ব্যবহার করলে আচার দীর্ঘদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। কারণ এটি একধরনের মৃদু অম্লিয় দ্রবণ। এর উপস্থিতিতে খাবারে ঈস্ট বা ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে না।
আচার খেতে পরিস্কার চামচ ব্যবহার করুন
আচার খাওয়ার সময় হাত দিয়ে তুলার পরিবর্তে চামচ ব্যবহার করতে হবে। চামচে যেনো পানি বা অন্য কোনো উপাদান না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ প্রতিবার আবার খাওয়ার সময়ে শুকনো ও পরিস্কার চামচ ব্যবহার করতে হবে। ফলে ছত্রাক সংক্রামণ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।
কাচের জারে সংরক্ষণ করুন
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেকোনো আচার কাচেঁর জারের মধ্যে সংরক্ষণ করতে হবে। এতে অনেকদিন পর্যন্ত আচার ভালো থাকে। সেই সাথে কখনোই প্লাস্টিকের পাত্রে আচার রাখা উচিত নয়, এতে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।


হলুদ, মেথি পাউডার ও হিং ব্যবহার
আচারের সংরক্ষণে হলুদ , মেথি পাউডার ও হিং খুব ভালো অপশন বলা যায়। হিং মসলাটি প্রায় অনেকের কাছে অপরিচিত। হিং এ অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদান থাকে । যা আমাদের হজমের সমস্যা দূর করে হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। হলুদ প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করে। মেথি পাউডার শরীরের কোলেস্টেরল মাথা নিয়ন্ত্রণ করে।
প্রতিদিন বয়াম রোদে দিন
প্রতিদিন এক ঘণ্টা হলেও আচারের বয়াম সূর্যের আলোয় রাখলে ফাংগাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আচার সংরক্ষণের উপায়গুলোর মধ্যে এটিও বেশ কার্যকরী। যদি ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আচার রাখলে প্রতিদিন রোদে দেওয়ার উপায় না থাকলেও সপ্তাহে রোদে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
ফ্রিজ এর নর্মালে আচার অনেকদিন ভালো থাকে
সাধারণত ঠাণ্ডা জায়গায় রাখলে আচারে ফাংগাস লাগতে পারে না। সেক্ষেত্রে ফ্রিজ বা রেফ্রিজারেটর একটি ভালো অপশন বলা যায়। রেফ্রিজারেটর এর নরমালে আচার রাখলে দীর্ঘদিন ভালো থাকে। তবে মাঝে মধ্যে ফ্রিজ থেকে বের করে রোদে দিতে হবে।
পরিস্কার পাত্রে সংরক্ষণ করুন
যে পাত্রে আচার রাখা হবে সেই পাত্রটি ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। এতে ফাংগাস লাগার সম্ভাবনা কম থাকে। যদি আচার রাখার বোয়াম বা পাত্রে পানি থাকে সেক্ষেত্রে আচারে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পরতে পারে। এবং আচার নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তেঁতুলের আচারের রেসিপি, গুনাবলি এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি
খোলামেলা ও পরিস্কার জায়গায় সংরক্ষণ করুন
আচার তৈরি করার পরে অতিরিক্ত গরম বা উষ্ণ জায়গায় সংরক্ষণ করা যাবে না। এটি পরিষ্কার শুকনো জায়গায় যেমন ক্যাবিনেট বা বেসমেন্ট সংরক্ষণে করা যেতে পারে।
বয়ামে লেভেল দিয়ে মেয়াদ ট্র্যাক করতে পারেন
আচারের জারে উৎপাদনের তারিখ দিয়ে একটি লেবেল ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে আচারের মেয়াদ সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা রাখা যায়।
সোডিয়াম বেনজোয়েট অ্যাসিড ব্যবহার
আচার সংরক্ষণে সোডিয়াম বেনজোয়েট অ্যাসিড বেশ কার্যকরী। এটি মূলত ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট ও ছত্রাক বৃদ্ধি রোধ করে থাকে। প্রতি কেজি আচারে এক গ্রাম সোডিয়াম বেনজয়েট থাকতে পারে।
রোদে শুকানোর সময় মুখ খুলে দিবেন
আচারে রোদে দেওয়ার সময় বোয়ামের মুখ খুলে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে বোয়ামের মুখে পাতলা কাপড় বা নেট জাতীয় কিছু বিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে। যদি মুধ বন্ধ অবস্থাতেই রোদে দেওয়া হয়, তাহলে রোদে থেকে আনার পর ২০-৩০ মিনিটের জন্য বয়ামের মুখ খুলে রাখতে হবে। যাতে জলীয় বাষ্প উড়ে যেতে পারে। এবং বোয়ামের মুখে যদি কোনো পানি জমে থাকলে তা মুছে দিতে হবে। কারণ মুখ বন্ধ রেখে রোদে দিলে বোয়ামের ভিতরে জলীয় বাষ্প হয়ে পানি জমতে পারে আচারে। ফলে আচারে ছত্রাক ধরতে পারে।
সরিষার তেল ব্যবহার
আচার তৈরিতে সবসময় সরিষার তেল ব্যবহার করতে হবে। কারণ এতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রয়েছে। যা আচারে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ধরতে বাধা দেয়। এবং কখনোই অলিভ অয়েল বা অন্য কোনো ভোজ্য তেল ব্যবহার করা উচিত নয়।
আচার সংরক্ষণে বোয়ামের ব্যবহার


কাচের বোয়াম
বর্তমানে প্রত্যেকের বাড়িতেই কাচের বোয়াম থাকে। এছাড়াও বাজারে খুব সহজেই কিনতে পাওয়া যায় কাচের বোয়াম। এটি আচার সংরক্ষণের জন্য সর্বোত্তম উপায়। কারণ আচার একটি অম্লিয় খাবার। যা কাচের বোয়ামে রাখলে উপাদানগুলো কোনো প্রতিক্রিয়া করে না। যা ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক সংক্রমণ রোধ করে। ফলে কাচের বোয়ামে আচার রাখলে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভালো থাকে।
সিরামিকের বোয়াম
সাধারণত সিরামিকের বোয়াম বা পাত্রে নোনতা আইটেম ও আচার রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই পাত্রে আচার রাখলে দীর্ঘদিনের জন্য ভালো থাকে। সিরামিকের বোয়াম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঢাকনার নীচে পলিথিন শীট রাখতে হবে। যা বাতাস প্রবেশ করতে না পারে।
প্লাস্টিকের বোয়াম
আমাদের হাতের নাগালে রয়েছে প্লাস্টিকের বোয়াম। আচার প্লাস্টিকের বোয়ামেও রাখা যায়। তবে এতে দীর্ঘ সময়ের জন্য রাখলে দ্রুত ছত্রাক ধরতে পারে। ফলে আচার দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কারণ আচারে লবন ও অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি হওয়ায় প্লাস্টিকের বোয়ামে বিক্রিয়া করে।
এয়ার টাইট ফুড গ্রেড বক্স
আচারের সংরক্ষণের জন্য এয়ার টাইট ফুড গ্রেড বক্সটিও ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ এতে বাতাস সহজে প্রবেশ করতে পারে না।
সুতরাং আচার দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য বোয়াম নির্বাচণের ক্ষেত্রে কাচের বোয়াম বা জার ব্যবহার করা উত্তম। এবং আচার ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৬ মাস পর্যন্ত ও ফ্রিজে ১ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা খুব সহজেই আচার ছত্রাকমুক্ত কিভাবে রাখতে পারি সেই সম্পর্কে বেশ কিছু সহজ উপায় বিস্তারিত জানতে পারলাম। তাই আচার সংরক্ষণের নিময়গুলো যথারীতি মেনে চললে আচার নষ্ট হওয়া নিয়ে আর চিন্তার থাকবে না। নিশ্চিন্তে আচার তৈরি করে দীর্ঘসময়ের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে।