বাকরখানি বাংলাদেশ তথা পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী রুটি জাতীয় খাবার। প্রায় ৩০০ বছর আগে থেকে বাংলায় এই খাবারের প্রচলন হয়ে আসছে। হালকা থেকে ভারী নাস্তা এবং বন্ধুদের আড্ডায় বাকরখানি অনেক পরিচিত খাবার। এটি খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিকর। কোন ভেজাল উপাদান ব্যবহার করা হয় না জন্য নিশ্চিন্তে যে কোনো বয়সের মানুষ বাকরখানি খেতে পারে। আমাদের আজকের লেখায় আমরা বাকরখানি কি, এবং তা কীভাবে তৈরি করা হয় সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো।
বাকরখানি কি?
বাকরখানি একটি রুটি জাতীয় খাবার। সাধারণত বাংলাদেশের পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো এই বাকরখানি। পুরান ঢাকা বরাবরই নানা মুখরোচক ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য শিরোনামে থাকে। আমরা কথায় কথায় যে বিরিয়ানির কথা বলি তা উক্ত এলাকার নামে পুরো দেশে পরিচিত। দোকানে পুরান ঢাকার সিল না থাকলে আমরা বিরিয়ানি খেতে চাই না।
যাইহোক, বাকরখানি বিরিয়ানির মতই একটি বিশেষ রুটি জাতীয় খাবার। দেখতে অনেকটা পেটিসের মত এই খাবার সাধারণত সকালে এবং বিকেলে নাস্তার সাথে খাওয়া হয়। নাস্তা ব্যতীত বাকরখানি খালি হিসেবেও খাওয়া যায়। বিশেষ পদ্ধতিতে নানা উপাদান মিশিয়ে এই খাবার তৈরি করা হয়। এই কারণে গতানুগতিক রুটির থেকে এর স্বাদ এবং গন্ধ আলাদা হয়।
পুরান ঢাকার বাকরখানির ইতিহাস


বাকরখানির উৎপত্তি নিয়ে সমাজে সাধারণত দুই ধরনের ধারণা প্রচলিত আছে। দুটি ঘটনাই অনেক পুরোনো ও হৃদয়বিদারক। কোন কোন বর্ণনা মতে, তৎকালীন মুর্শিদ কুলী খাঁ এর দত্তক নেওয়া ছেলে আগা বাকের রাজধানী মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগমের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়। আগা বাকের নিজে একজন অতুলনীয় যোদ্ধা এবং প্রেমিক ছিলেন। তাদের দুইজনের মধ্যকার প্রেমের মধ্যে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ঢুকে পরেন উজিরপুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খান।
তিনি খনি বেগমকে প্রেমের প্রস্তাব দেয় যা সে প্রত্যাখ্যান করে। এতে জয়নাল রাগান্বিত হয় এবং খনি বেগমের ক্ষতি করার জন্য তাকে বন্দী করে। এই খবর আগা বাকেরের কাছে পৌঁছালে সে তৎক্ষণাৎ সেখানে রওনা হয় এবং তলোয়ারবাজিতে জয়নাল খানকে হারায়। এই মোক্ষম সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জয়নালের কাছের দুইজন বন্ধু উজির কে খবর দেয় তার ছেলে কে আগা বাকের মেরে ফেলেছে।
উজির তৎক্ষণাৎ মুর্শিদ কুলী খাঁর কাছে তার ছেলে হত্যার বিচার চায়। তিনি আগা বাকেরকে বাঘের খাঁচায় বন্দী করার নির্দেশ দেয় যেখানে সে উক্ত বাঘকে মেরে ফেলে। এই সুযোগে জয়নাল খান খনি বেগমকে অপহরণ করে দক্ষিণে পালিয়ে যায়। তাকে শায়েস্তা করার জন্য আগা বাকের পিছু নেয় এবং তাদের পেছনে উজির ও রওনা হয়।
মুখোমুখি সংঘর্ষে জয়নাল খান আগা বাকেরকে হত্যা করতে গেলে এক পর্যায় উজির তার নিজের ছেলে এবং খনি বেগমকে হত্যা করে। দুঃখে ভারাক্রান্ত আগা বাকের তৎকালীন বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ এলাকায় খনি বেগমের সমাধি স্থাপন করে এবং সেখানেই থেকে যায়। এই কারণে উক্ত এলাকার নাম হয় বাকেরগঞ্জ। পরবর্তীতে বাকের এবং খনির প্রেম কাহিনীর উপর ভিত্তি করে এই রুটির নাম রাখা হয় বাকরখানি।
অন্য একটি মতামতে বলা হয়, তৎকালীন বরিশালের জায়গির মির্জা আগা বাকের তার প্রিয়তমা আরামবাগের নর্তকী খনি বেগমকে ভালো বাসতেন। পরবর্তী কালে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তিনি আগা বাকের ২য় মুর্শিদ কুলি খাঁর কন্যাকে বিয়ে করেন। তার আর তার প্রেমিকার প্রেম অমর করে রাখতে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা এই রুটির নাম করন করেন বাকের-খনি রুটি। পরবর্তীতে এই নাম সামান্য পরিবর্তন হয়ে বাকরখানি তে রূপান্তরিত হয়েছে।
বাকরখানি কেন বিখ্যাত?
কোন খাবার বিখ্যাত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। নিচে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হল। আমরা জানি বগুড়া যেমন দই মিষ্টির জন্য বিখ্যাত, আবার নাটোর যেমন কাচাগোল্লা, ঠিক পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রুটি জাতীয় খাবার টি বেশ বিখ্যাত। আমরা সাধারণত রুটি খাই হয় আমাদের খুদা মিটাতে অথবা হালকা নাস্তা করতে। অনেক মানুষ নাস্তা করার সময় বিস্কিট অথবা টোস্ট চায়ে ভিজিয়ে খায়। এছাড়াও একেক জনের একেক ধরুনের পদ্ধতি থাকে। যাইহোক, পুরান ঢাকায় প্রতিটি অলিতে গলিতে যেমন বিরিয়ানির দোকান পাওয়া যায় তেমনি বাকরখানির দোকান পাওয়া যায়।
বলা হয়ে থাকে করুন প্রেমকাহিনীর সাক্ষী এই খাবার ছোট থেকে বড় সবার অনেক পছন্দ। এত বেশি পছন্দ হওয়ার কারণ হল এর তৈরি প্রণালি। তৈরি করার সময় এমন সকল উপাদান ব্যবহার করা হয় যা এর একটি রুটির স্বাদ দ্বিগুণ করে। অন্যদিকে, বাকরখানি তৈরি করা হয় তন্দুর রুটির মত করে। এটি নরম এবং মচমচে সহ পনির, মিষ্টি, নোনতা, কাবাব, কিমা, ঘি, কালোজিরা, খাস্তা এই সাত রকমের স্বাদে পাওয়া যায়।
তাহলে চিন্তা করে দেখুন এর বিশালতা এবং ব্যাপ্তি কত দূর। যাইহোক, বাকরখানি ছোট, বড়, মাঝারি এবং পাতলা সব ধরনের আকৃতিতে পাওয়া যায়। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে বিকেলের অথবা রাতে হালকা নাস্তায় এটি সব থেকে বেশি ব্যবহার করে হয়। হঠাৎ বাসায় আত্মীয় আসলে বাকরখানি দিয়ে সহজেই উন্নতমানের আপ্যায়ন করা যায়।
বাকরখানি সম্পূর্ণ ভেজাল মুক্ত উপকরণ থেকে তৈরি করা হয়। যদি কোন কারণে উক্ত উপাদানের মধ্যে ভেজাল থাকে তবে তা নরম ও মুচমুচে না হয়ে শক্ত হবে যা খেতে ভালো লাগে না। “ঢাকা পাচাস বারাস পাহলে” গ্রন্থে এই খাবারের জনপ্রিয়তার কথা বলা হয়েছে। সে তথ্য মতে তৎকালীন সময়ে বাকরখানি ঢাকা শহরে এত পরিমাণ জনপ্রিয়তা পায় যা পরবর্তীতে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে সহ পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পরে।
বর্তমান সময়ে ঢাকার বাকরখানি কুয়েত, শ্রীলঙ্কা, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেলিভারি করা হয়। অর্থাৎ আপনি যদি এই সকল দেশে গিয়ে থাকেন এবং বাকরখানি খেতে ইচ্ছা করে তাহলে অর্ডার করলে সঠিক স্থানে পৌঁছে যাবে। তো বলা যায় বাকরখানির ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রচলিত। সেই মুঘল আমল থেকে এই বিশেষায়িত রুটি আমাদের নানা বয়সী মানুষের মন জয় করে আসছে।
বাকরখানি তৈরির রেসিপি


বাকরখানি তৈরি করার অন্যান্য রুটি তৈরি করার মত অত সহজ না। কারণ এতে বিভিন্ন উপাদান পরিমাণ মত ব্যবহার করতে হয়। অন্যথায় এই রুটি সঠিক পদ্ধতিতে তৈরি হয় না। নিচে পুরান ঢাকার বাকরখানি তৈরির রেসিপি দেওয়া হলো।
উপকরনঃ গম, দুধ, লবণ, চিনি, ডালডা, ঘি, পনির খামির, জাফরান, পোস্ত বা নিগেল্লার বীজ
বাকরখানি কিভাবে তৈরি করবেন?
বাকরখানি তৈরি করার জন্য সাধারণ তাওয়া ব্যবহার করা হয় না। নান রুটি তৈরি করার যে বিশেষ চুলা পাওয়া যায় তাতে এই রুটি তৈরি করা হয়। তো বাকরখানি তৈরি করার জন্য সবার প্রথমে খামির তৈরি করে নিতে হবে। সাধারণত বাকরখানির খামির তৈরি করার উপর এর স্বাদ এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে।
অর্থাৎ যদি খামির তৈরি করার সময় কোন উপকরণ দেওয়া না হয় তাহলে উক্ত খামির পরিপূর্ণ হবে না। তো প্রথমে পরিমাণ মত ময়দা নিয়ে তা গলানো ডালডার সাথে তেল ও লবণ মিশিয়ে খাস্তা তৈরি করে নিতে হবে। এরপর কিছু পরিমাণ ময়দা উক্ত খাস্তার সাথে মিশিয়ে দুই ঘণ্টার মত রেখে দিতে হবে। তারপর পুনরায় গলানো ডালডা উক্ত ময়দার খাস্তার সাথে মিশিয়ে নিতে হবে।
মূলত খামির তৈরি করার জন্য বাকরখানির সকল উপাদান এক সাথে মিশিয়ে কিছু সময়ের জন্য রেখে দিতে হবে। তারপর প্রস্তুতকৃত খামির থেকে পরিমাণ মত গোল কোয়া তৈরি করে নিতে হবে। পরবর্তীতে সেই কোয়া বেলন দিয়ে দলে রুটির মত তৈরি করতে হবে।
এখানে আপনি চাহিদা মত রুটি মোটা, বড় অথবা পাতলা করতে পারবেন। তারপর রুটির এক পাসে হালকা পানি আলতোভাবে ডোলে তা তন্দুরের মধ্যে দিতে হবে। সাধারণত ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যেই বাকরখানি তৈরি হয়ে যাবে।