কালোজিরা একটি অনন্য পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ঔষধি শস্য। কালোজিরার ফুলের মধু থেকে উৎপাদিত মধু স্বাদে এবং পুষ্টিগুণে অন্যান্য মধু থেকে অনেক এগিয়ে। এতে রয়েছে দেহের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ধরনের পুষ্টি এবং উপকারী উপাদান। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এই মধু ক্যানসার প্রতিরোধ করতেও সক্ষম। আমাদের আজকের লেখায় কালোজিরা মধুর উপকারিতা, খাওয়ার নিয়ম ও চেনার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
কালোজিরা মধুর উপকারিতা


কালোজিরা মধু বলতে সাধারণত কালোজিরা ফুলের মধুকে বুঝায়। বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে কালোজিরার ফুল ফোটে। এই সময় প্রাকৃতিকভাবে মধু খামারিগণ তাদের মৌমাছি দিয়ে ফুলের নেক্টার সংগ্রহ করে মধু প্রক্রিয়াজাত করে। আমরা ইতিমধ্যে জানি যে কালোজিরা একটি উচ্চ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ বীজ জাতীয় উপাদান।
এটি দেখতে কালো হলেও অনন্য স্বাদ এবং গন্ধের অধিকারী। কালোজিরার মধুর রয়েছে অসীম পুষ্টিগুণ। এতে অন্যান্য পুষ্টিগুণের পাশাপাশি রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি এবং সি। এগুলো ছাড়াও কালোজিরা মধু বা কালোজিরা ফুলের মধুর উপকারিতা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য কালোজিরা অনেক কার্যকর। এতে থাকা পুষ্টি উপাদান দেহের মধ্যে থাকা খারাপ প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং সহজেই রোগাক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়। অন্যদিকে কালোজিরার মধু খেতে অনেক সুস্বাদু এবং অন্য খাবারের সাথে মিশিয়ে এর পুষ্টিগুণ আরও বৃদ্ধি করা যায়। তাছাড়া এই মধুতে থাকা এন্টিঅক্সিডেন্ট দেহের কোষগুলোকে শক্তিশালী করে যা সম্ভাব্য রোগ থেকে মুক্তি দেয়।
ক্যানসার প্রতিরোধ করে
কেরটিন মানব দেহের এমন একটি উপকারী উপাদান যা ক্যানসার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। প্রকৃতিতে পাওয়া অনেক খাদ্যে এই উপাদান অনুপস্থিত থাকলেও কালোজিরার মধুতে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। নিয়মিত এই মধু সেবন করলে সম্ভাব্য ক্যানসার রোগ দেহে বাসা বাঁধতে পারে না। এই কারণে সকল ধরনের চিকিৎসা শাস্ত্রে কালোজিরা ও এর মধুকে মহৌষধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
রক্তচাপ কমায়
অতিরিক্ত রক্তচাপ একজন মানুষের স্ট্রোক হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। আমাদের চারপাশে প্রায়ই স্ট্রোক করে মারা যাবার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। বিশেষ করে যুবক বয়সে মানুষ উচ্চ রক্তচাপ সমস্যায় ভুগে মারা যাচ্ছে। এই ঝামেলা থেকে মুক্ত রাখতে নিয়মিত কালোজিরার মধু খেতে পারেন। কারণ এটি উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে দেহের স্বাভাবিক রক্ত চলাচল নিশ্চিত করে।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে
ডায়াবেটিস একজন মানুষের জীবনে অভিশাপের শামিল। কারণ এই রোগ হওয়ার পর অনেক কঠিন এবং কষ্টকর রুটিন মেনে জীবনযাপন করতে হয়। একটু অনিয়ম হলেই রক্তে সুগার বৃদ্ধি পায় এবং নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করে। এই রোগ হলে যেমন নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করা প্রয়োজন তেমনি পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়া প্রয়োজন। কালোজিরার মধুতে রয়েছে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে।
কোলেস্টরেল মুক্ত
দেহের জন্য ক্ষতিকারক কোলেস্টরেল অনেক জটিল সমস্যার জন্য দায়ী। তবে কালোজিরার মধুতে স্বল্প পরিমাণে এই উপাদান থাকায় আমাদের তেমন একটা চিন্তা করতে হয় না। বিশেষ করে কালোজিরার মধু আমাদের শারীরিক ও মানুষিক স্বাস্থ্যের জন্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী উপাদান।
লিভার ফ্যাট কমায়
লিভার ফ্যাট শরীরের জন্য অনেক ক্ষতিকর একটি সমস্যা। এই ফ্যাট থেকে লিভারের বিভিন্নরকম সমস্যা যেমন আলসার অথবা লিভার সিরোসিস সংঘটিত হয়। কালোজিরা ফুলের মধু লিভারে জমে থাকা অতিরিক্ত ফ্যাট কমায়। এতে সম্ভাব্য লিভার সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ করে
অ্যাজমা একটি অতি মারাত্মক কষ্টদায়ক রোগ। বিশেষ করে শীতকালে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়। যাদের মধ্যে এজমার সমস্যা পূর্বে থেকেই আছে তাদের জন্য কালোজিরার মধু একটি উপশম হিসেবে কাজ করে। এটি শ্বাসনালীর পেশি সংকুচিত ও প্রসারিত হতে সাহায্য করে যা পরিমাণমতো বাতাস প্রবাহ স্বাভাবিক রাখে। এই কারণে প্রতিদিন নিয়ম করে কালোজিরার মধু খেলে তা শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানি সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে।
ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে
বিভিন্ন কারণেই আমাদের দেহের অনেক জায়গায় ব্যথার সৃষ্টি হয়। এদের মধ্যে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যথা এবং হাড়জোর ও মাংসপেশির ব্যথা অন্যতম। এই ব্যথার সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে আমরা অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। তবে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়া কালোজিরা ফুলের মধু ব্যথানাশক হিসেবে অনেক ভালো কাজ করে। বিশেষ করে ত্বকের প্রদাহ, মাংসপেশির প্রদাহ, হাড়জোর ব্যথা সহ সকল প্রকার জয়েন্টের ব্যথা নিরাময় করতে এই মধু কাজ করে।
হজম শক্তি বৃদ্ধি করে
পেটে আসিডিটি সমস্যা থাকলে তা থেকে আলসার, হজম সমস্যা সহ অনেক শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। খাবার গ্রহণ করার পর যদি তা ঠিকমতো হজম না হয় তবে উক্ত খাবার থেকে পাওয়া পুষ্টিগুণ আমাদের কোন কাজে লাগে না। এই দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় আমরা নিয়মিত খাবার খাওয়ার পরেও অপুষ্টিতে ভুগি।
কালোজিরার মধু পেটের অম্লতা দূর করতে সাহায্য করে। এই কারণে হজম হওয়ার জন্য যে সকল এনজাইম প্রয়োজন তা ঠিক মত সরবরাহ হয় এবং পাচন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। সকালে খালি পেটে কালোজিরার মধু সেবন করলে হজম শক্তি বৃদ্ধি পায়।
রক্ত পরিষ্কার রাখে
রক্ত আমাদের দেহের একটি অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। সঠিক পদ্ধতিতে রক্ত সঞ্চালন হলে তা আমাদের দেহের সকল কোষ জীবিত রাখার পাশাপাশি হার্ট সচল রাখে। এই কারণে দেহের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে হয়। কালোজিরার মধু এই রক্ত পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। তাছাড়া রক্তে থাকা বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি সমন্বয় করতে এই মধু সহায়তা করে। সর্বোপরি রক্ত পরিষ্কার রাখার জন্য কালোজিরা ফুলের মধু অনেক কার্যকরী।
হার্টের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে
আমরা জানি যে হার্ট সুস্থ রাখার জন্য স্বাভাবিক বিশুদ্ধ রক্ত সঞ্চালন সহ এর গঠন সচল রাখতে হয়। কালোজিরার মধু হার্টের পেশীগুলো সচল রাখার পাশাপাশি বিসিদ্ধ রক্ত সঞ্চালন করতে সহায়তা করে। এতে হার্টের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান হয়। সে কারণে হার্ট অ্যাটাকসহ অন্যান্য হৃৎপিণ্ড সম্পর্কীয় সমস্যা নিরাময় হয়।
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে
কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা থাকলে তা দেহের স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত করার পাশাপাশি জন্ডিস ও পাইলস রোগের সৃষ্টি করে। তাছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য দেহের পুষ্টিহীনতার সৃষ্টি করে। নিয়মিত কালোজিরা ফুলের মধু খেলে তা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে পেটের অম্লতা নিয়ন্ত্রণ করে। সাথে সাথে হজম শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং খাবারের রুচি বৃদ্ধি পায়।
কালোজিরা মধু খাওয়ার নিয়ম
একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন দুই বেলা করে কালোজিরার মধু খাওয়া উচিত। বিশেষ করে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১ বা ২ চামচ কালোজিরার ফুলের মধু খাওয়া যেতে পারে। তবে চাহিদা অনুযায়ী রাতের খাবার শেষে ৩০ অথবা ৪০ মিনিট পর এই মধু খেলে উপকার পাওয়া যায়।
বাচ্চা অথবা গর্ভবতী মহিলাদের জন্য উপসর্গ বুঝে পরিমাণ এবং সময়ের হেরফের করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে এই মধু অনেক উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন। অনিয়মিত অথবা ভুল প্রয়োগের ফলে হিতে বিপরীত হতে পারে। কালোজিরা মধু খালি খাওয়ার থেকে বাদাম বা অন্য কোন খাবারের সাথে গ্রহণ করলে বেশি পুষ্টিগুণ পাওয়া যায়। এই কারণে অনেকেই হানি নাট তৈরি করার সময় অন্যান্য মধুর সাথে কালোজিরা ফুলের মধু মিশ্রিত করে।
কালোজিরা মধু চেনার উপায়


কালোজিরা মধু চেনা অনেক সহজ। কারণ এই মধু দেখতে অনেকটা খেজুরের গুঁড়ের মত দেখা যায়। এই মধু দেখতে লাল কালচে ধরনের হয়। ঘনত্বের দিক থেকে গাঢ় ও পাতলা দুই ধরনের হয়। স্বাদের দিক থেকে এই মধু পুরোপুরি খাঁটি খেজুরের গুঁড়ের মতই হয়। অন্যদিকে এই গন্ধও খেজুরের গুঁড়ের মতই লাগে। সাধারণত যদি সরিষা সহ অন্যান্য ফুলের মধু মিশ্রিত না থাকে তবে কালোজিরার ফুলের মধু জমাট বাধে না।
কালোজিরা ফুলের মধুর বিভিন্ন উপকারী দিক এবং সহজেই এই মধু চেনার উপায় সম্পর্কে আমাদের মাঝে বিভিন্ন প্রশ্ন ছিল যা এই লেখার মাধ্যমে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। আশা করি কালোজিরা মধু সঠিকভাবে ব্যবহার করতে আর কোনো বাঁধা থাকবে না।